🌍 মহাকর্ষ ও অভিকর্ষ 🌍

HSC পদার্থবিজ্ঞান - একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি

১. ভূমিকা - মহাকর্ষ ও অভিকর্ষ কী?

মহাকর্ষ (Gravitation)

মহাবিশ্বের যেকোনো দুটি বস্তুর মধ্যে পারস্পরিক আকর্ষণ বলকে মহাকর্ষ বল বলে। এটি একটি সার্বজনীন বল যা প্রকৃতির চারটি মৌলিক বলের একটি।

অভিকর্ষ (Gravity)

পৃথিবী তার কেন্দ্রের দিকে যেকোনো বস্তুকে যে আকর্ষণ বলে টানে তাকে অভিকর্ষ বল বলে। এটি মহাকর্ষ বলের একটি বিশেষ রূপ।

⚡ মনে রাখুন:
  • মহাকর্ষ = যেকোনো দুটি বস্তুর মধ্যে আকর্ষণ
  • অভিকর্ষ = পৃথিবীর আকর্ষণ বল
  • মহাকর্ষ বল সবসময় আকর্ষণমূলক, কখনো বিকর্ষণমূলক নয়
  • এটি দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক

প্রকৃতির চারটি মৌলিক বল

  1. মহাকর্ষ বল (Gravitational Force) - সবচেয়ে দুর্বল কিন্তু দূরপাল্লার
  2. তড়িৎ-চৌম্বক বল (Electromagnetic Force) - আহিত কণার মধ্যে
  3. দুর্বল নিউক্লিয় বল (Weak Nuclear Force) - তেজস্ক্রিয় ক্ষয়
  4. সবল নিউক্লিয় বল (Strong Nuclear Force) - নিউক্লিয়াসকে বেঁধে রাখে
📝 তথ্য: মহাকর্ষ বল তড়িৎ-চৌম্বক বলের তুলনায় 10³⁶ গুণ দুর্বল এবং সবল নিউক্লিয় বলের তুলনায় 10³⁸ গুণ দুর্বল।

২. নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র

সূত্রের বিবৃতি

মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুকণা একে অপরকে নিজেদের ভরের গুণফলের সমানুপাতিক এবং তাদের মধ্যবর্তী দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক বলে আকর্ষণ করে। এই বল দুই বস্তুর কেন্দ্র সংযোগকারী সরলরেখা বরাবর ক্রিয়া করে।

F = G × (m₁ × m₂) / r²

যেখানে:

  • F = মহাকর্ষ বল (নিউটন)
  • G = সার্বজনীন মহাকর্ষীয় ধ্রুবক = 6.67 × 10⁻¹¹ N·m²/kg²
  • m₁, m₂ = দুটি বস্তুর ভর (কিলোগ্রাম)
  • r = দুটি বস্তুর কেন্দ্রের মধ্যবর্তী দূরত্ব (মিটার)

মহাকর্ষ বলের বৈশিষ্ট্য

  1. সার্বজনীন: মহাবিশ্বের সকল বস্তুর মধ্যে ক্রিয়াশীল
  2. কেন্দ্রমুখী বল: দুটি বস্তুর কেন্দ্র সংযোগকারী রেখা বরাবর
  3. আকর্ষণমূলক: সবসময় আকর্ষণ, কখনো বিকর্ষণ নয়
  4. রক্ষণশীল বল: কৃত কাজ পথ-নিরপেক্ষ
  5. দূর্বল বল: অন্যান্য মৌলিক বলের তুলনায় অত্যন্ত দুর্বল
  6. মাধ্যম নিরপেক্ষ: মাধ্যমের উপর নির্ভর করে না
  7. ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া: নিউটনের তৃতীয় সূত্র মেনে চলে
⚠️ গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা:
  • বস্তুদুটি অবশ্যই বিন্দুভর বা গোলাকার হতে হবে
  • অতি ক্ষুদ্র দূরত্বে (10⁻⁹ মিটারের কম) প্রযোজ্য নয়
  • অতি উচ্চ মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে (ব্ল্যাক হোল) সংশোধন প্রয়োজন

ভেক্টর রূপ

F⃗₁₂ = -G × (m₁ × m₂) / r² × r̂₁₂

ঋণাত্মক চিহ্ন নির্দেশ করে বলটি আকর্ষণমূলক (বিপরীত দিকে)

🎯 ইন্টারেক্টিভ সিমুলেশন: নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র

মহাকর্ষ বল = ... নিউটন

৩. সার্বজনীন মহাকর্ষীয় ধ্রুবক (G)

মান ও একক

G = 6.67430 × 10⁻¹¹ N·m²/kg²

বা, G = 6.67430 × 10⁻¹¹ m³/(kg·s²)

G এর বৈশিষ্ট্য

  • এটি একটি সার্বজনীন ধ্রুবক - সমগ্র মহাবিশ্বে একই মান
  • স্থান, কাল, তাপমাত্রা বা মাধ্যমের উপর নির্ভর করে না
  • বস্তুর আকার, আকৃতি বা ভরের উপর নির্ভর করে না
  • মাত্রা: [M⁻¹L³T⁻²]

G এর পরিমাপ: ক্যাভেন্ডিশ পরীক্ষা (1798)

হেনরি ক্যাভেন্ডিশ প্রথম G এর মান নির্ণয় করেন একটি টর্শন ব্যালান্স ব্যবহার করে।

পরীক্ষার বর্ণনা:

  1. একটি হালকা রডের দুই প্রান্তে দুটি ছোট সীসার গোলক (m) স্থাপন করা হয়
  2. রডটি একটি সূক্ষ্ম তারের সাহায্যে ঝুলানো হয়
  3. দুটি বড় সীসার গোলক (M) ছোট গোলকের কাছে আনা হয়
  4. মহাকর্ষ বলের কারণে রডটি ঘুরে যায় এবং তার পেঁচানো হয়
  5. পেঁচানোর কোণ থেকে মহাকর্ষ বল এবং তারপর G নির্ণয় করা হয়
G = (2πθL²r²) / (Mm × T²)

যেখানে:

  • θ = পেঁচানোর কোণ
  • L = রডের দৈর্ঘ্য
  • r = গোলকদের মধ্যবর্তী দূরত্ব
  • T = দোলনের পর্যায়কাল
📝 ঐতিহাসিক তথ্য: ক্যাভেন্ডিশকে বলা হয় "যিনি পৃথিবীকে ওজন করেছেন" কারণ G জানা থাকলে পৃথিবীর ভর নির্ণয় করা যায়।

G এর ভৌত তাৎপর্য

G এর সংখ্যাগত মান হলো দুটি 1 kg ভরের বস্তুর মধ্যে 1 m দূরত্বে উৎপন্ন মহাকর্ষ বল।

উদাহরণ: দুটি 1 kg ভরের বস্তু 1 m দূরত্বে রাখলে তাদের মধ্যে মহাকর্ষ বল হবে:

F = G × (1 × 1) / 1² = 6.67 × 10⁻¹¹ N

এটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র - একটি মশার ওজনের প্রায় 10 মিলিয়ন ভাগের এক ভাগ!

৪. অভিকর্ষজ ত্বরণ (g)

সংজ্ঞা

পৃথিবীর মহাকর্ষীয় আকর্ষণের ফলে কোনো বস্তুর যে ত্বরণ সৃষ্টি হয় তাকে অভিকর্ষজ ত্বরণ বলে। একে 'g' দ্বারা প্রকাশ করা হয়।

g এর মান নির্ণয়

g = GM/R²

যেখানে:

  • G = 6.67 × 10⁻¹¹ N·m²/kg²
  • M = পৃথিবীর ভর = 5.97 × 10²⁴ kg
  • R = পৃথিবীর ব্যাসার্ধ = 6.37 × 10⁶ m

g ≈ 9.8 m/s² (পৃথিবীর পৃষ্ঠে)

নিগমন

যদি m ভরের একটি বস্তু পৃথিবীর পৃষ্ঠে থাকে, তাহলে পৃথিবী কর্তৃক আকৃষ্ট বল:

F = GMm/R² ... (নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র থেকে)

F = mg ... (নিউটনের দ্বিতীয় সূত্র থেকে)

∴ mg = GMm/R²

∴ g = GM/R²

g এর বৈশিষ্ট্য

  • g একটি ভেক্টর রাশি, দিক পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে
  • g এর মান বস্তুর ভরের উপর নির্ভর করে না
  • বিভিন্ন স্থানে g এর মান ভিন্ন হয়
  • মুক্তভাবে পড়ন্ত সকল বস্তুর ত্বরণ একই (বায়ুর বাধা উপেক্ষা করে)

বিভিন্ন মহাজাগতিক বস্তুতে g এর মান

মহাজাগতিক বস্তু g (m/s²) পৃথিবীর তুলনায়
পৃথিবী 9.8 1
চাঁদ 1.62 ≈ 1/6
সূর্য 274 ≈ 28
মঙ্গল 3.71 ≈ 0.38
বৃহস্পতি 24.79 ≈ 2.53
বুধ 3.70 ≈ 0.38
⚡ মনে রাখুন: চাঁদে একজন মানুষের ওজন পৃথিবীর ওজনের প্রায় 1/6 ভাগ হবে কিন্তু ভর একই থাকবে।

পৃথিবীর ভর ও গড় ঘনত্ব নির্ণয়

পৃথিবীর ভর: M = gR²/G

M = (9.8 × (6.37 × 10⁶)²) / (6.67 × 10⁻¹¹)

M ≈ 5.97 × 10²⁴ kg


পৃথিবীর গড় ঘনত্ব: ρ = M/V = M / (4πR³/3)

ρ = 3g / (4πGR)

ρ ≈ 5500 kg/m³ বা 5.5 g/cm³

🎯 সিমুলেশন: মুক্তভাবে পতন

সময় = 0 s | বেগ = 0 m/s | দূরত্ব = 0 m

৫. অভিকর্ষজ ত্বরণের পরিবর্তন

অভিকর্ষজ ত্বরণ g এর মান বিভিন্ন কারণে পরিবর্তিত হয়:

৫.১ উচ্চতার সাথে g এর পরিবর্তন

পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে যত উপরে যাওয়া যায়, g এর মান তত কমে যায়।

g_h = g(1 - 2h/R) [যখন h << R]

বা, g_h = g × R² / (R + h)² [সঠিক সূত্র]

যেখানে:

  • g_h = h উচ্চতায় অভিকর্ষজ ত্বরণ
  • g = পৃষ্ঠে অভিকর্ষজ ত্বরণ
  • h = উচ্চতা
  • R = পৃথিবীর ব্যাসার্ধ

নিগমন:

পৃষ্ঠে: g = GM/R²

h উচ্চতায়: g_h = GM/(R+h)²

∴ g_h/g = R²/(R+h)² = [R/(R+h)]² = [1/(1+h/R)]²

যখন h << R, (1+h/R)⁻² ≈ 1 - 2h/R (দ্বিপদ সূত্র)

g_h = g(1 - 2h/R)

উদাহরণ: পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে 3200 km উচ্চতায় g এর মান কত? (পৃথিবীর ব্যাসার্ধ 6400 km, g = 9.8 m/s²)

সমাধান: g_h = g(1 - 2h/R) = 9.8(1 - 2×3200/6400) = 9.8(1 - 1) = 0 m/s²

নোট: এখানে h = R/2, সরল সূত্রের সীমা অতিক্রম করেছে। সঠিক সূত্র ব্যবহার করলে:

g_h = g × R² / (R + h)² = 9.8 × (6400)² / (6400 + 3200)² = 9.8 / 2.25 ≈ 4.36 m/s²

৫.২ গভীরতার সাথে g এর পরিবর্তন

পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে যত গভীরে যাওয়া যায়, g এর মান তত কমে যায়। পৃথিবীর কেন্দ্রে g = 0।

g_d = g(1 - d/R)

যেখানে:

  • g_d = d গভীরতায় অভিকর্ষজ ত্বরণ
  • d = পৃষ্ঠ থেকে গভীরতা
  • R = পৃথিবীর ব্যাসার্ধ

কেন্দ্রে (d = R): g_d = g(1 - R/R) = 0

নিগমন:

পৃথিবীর ঘনত্ব সর্বত্র সমান ধরে, d গভীরতায় একটি বস্তুর উপর শুধুমাত্র (R-d) ব্যাসার্ধের গোলকের মহাকর্ষ বল কাজ করবে।

এই গোলকের ভর: M' = M × (R-d)³/R³

∴ g_d = GM'/(R-d)² = GM(R-d)³/(R³(R-d)²) = GM(R-d)/R³

∴ g_d = (GM/R²) × (R-d)/R = g(1 - d/R)

⚡ মূল পার্থক্য:
  • উচ্চতায়: g কমে যায় (বলের উৎস থেকে দূরে)
  • গভীরতায়: g কমে যায় (কার্যকর ভর কমে যায়)
  • উচ্চতায় হ্রাস দ্রুততর, গভীরতায় রৈখিক

৫.৩ পৃথিবীর আকৃতির জন্য g এর পরিবর্তন

পৃথিবী সম্পূর্ণ গোলাকার নয়, এটি মেরু অঞ্চলে চাপা এবং বিষুব অঞ্চলে স্ফীত। তাই:

  • মেরুতে: R সবচেয়ে ছোট → g সবচেয়ে বেশি (g_p ≈ 9.832 m/s²)
  • বিষুবরেখায়: R সবচেয়ে বড় → g সবচেয়ে কম (g_e ≈ 9.780 m/s²)

৫.৪ পৃথিবীর আহ্নিক গতির জন্য g এর পরিবর্তন

পৃথিবী তার নিজ অক্ষের চারদিকে ঘোরে। এই ঘূর্ণনের ফলে কেন্দ্রমুখী বলের প্রয়োজন হয়, যা আপাত g কমিয়ে দেয়।

g' = g - Rω²cos²λ

যেখানে:

  • g' = আপাত অভিকর্ষজ ত্বরণ
  • ω = পৃথিবীর কৌণিক বেগ = 2π/T = 7.3 × 10⁻⁵ rad/s
  • λ = অক্ষাংশ

মেরুতে (λ = 90°): g' = g (কোন প্রভাব নেই)

বিষুবরেখায় (λ = 0°): g' = g - Rω² (সর্বোচ্চ হ্রাস)

উদাহরণ: পৃথিবী যদি ঘুরা বন্ধ করে দেয়, বিষুবরেখায় g এর মান কত হবে?

বর্তমানে: g' = g - Rω² ≈ 9.78 m/s²

ঘুরা বন্ধ হলে: g = g' + Rω² ≈ 9.78 + 0.034 ≈ 9.814 m/s²

সম্মিলিত প্রভাব

বাস্তবে g এর মান নির্ভর করে:

  1. পৃথিবীর আকৃতি (মেরুতে চাপা)
  2. পৃথিবীর আহ্নিক গতি
  3. স্থানীয় ভূতাত্ত্বিক গঠন (ঘনত্ব)
  4. উচ্চতা
📊 বাস্তব মান:
  • মেরুতে: g ≈ 9.832 m/s²
  • বিষুবরেখায়: g ≈ 9.780 m/s²
  • 45° অক্ষাংশে: g ≈ 9.806 m/s²
  • গড় মান: g ≈ 9.8 m/s² (প্রায় সর্বত্র ব্যবহার্য)

🎯 সিমুলেশন: g এর পরিবর্তন

g = 9.8 m/s²

৬. মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র

সংজ্ঞা

কোনো বস্তুর চারপাশে যে অঞ্চলে অন্য বস্তু মহাকর্ষ বল অনুভব করে তাকে মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র বলে।

মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের তীব্রতা

মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের কোনো বিন্দুতে একক ভরের বস্তুর উপর ক্রিয়াশীল বলকে ঐ বিন্দুতে মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের তীব্রতা বলে।

I = F/m = GM/r²

বা, I = g (পৃথিবীর পৃষ্ঠে)

একক: N/kg বা m/s²

মাত্রা: [LT⁻²]

বৈশিষ্ট্য

  • এটি একটি ভেক্টর রাশি
  • দিক: ভর কেন্দ্রের দিকে (ভর ভেদ করা যায় তবে অভ্যন্তরে দিক বহির্মুখী হয়)
  • মান দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক
  • একাধিক ভরের ক্ষেত্রে ভেক্টর যোগফল নিতে হয়

মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র রেখা

  • ক্ষেত্র রেখা সবসময় ভর কেন্দ্রের দিকে নির্দেশ করে
  • দুটি ক্ষেত্র রেখা কখনো একে অপরকে ছেদ করে না
  • ক্ষেত্র রেখা ঘন হলে ক্ষেত্র শক্তিশালী
  • অসীম দূরত্বে ক্ষেত্র শূন্য
📝 তুলনা:
  • মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র ≈ তড়িৎ ক্ষেত্র
  • মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের তীব্রতা ≈ তড়িৎ ক্ষেত্রের তীব্রতা
  • পার্থক্য: মহাকর্ষীয় বল সবসময় আকর্ষণমূলক

৭. মহাকর্ষীয় বিভব

সংজ্ঞা

মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের কোনো বিন্দুতে একক ভরের বস্তুকে অসীম দূরত্ব থেকে ঐ বিন্দুতে আনতে যে পরিমাণ কাজ করতে হয় তাকে ঐ বিন্দুতে মহাকর্ষীয় বিভব বলে।

V = -GM/r

একক: J/kg বা m²/s²

মাত্রা: [L²T⁻²]

বৈশিষ্ট্য

  • এটি একটি স্কেলার রাশি
  • সবসময় ঋণাত্মক (অসীমে শূন্য ধরে)
  • যত কাছে যাওয়া যায়, বিভব তত বেশি ঋণাত্মক
  • পৃথিবীর পৃষ্ঠে: V = -GM/R = -gR

মহাকর্ষীয় বিভব শক্তি

m ভরের বস্তুর মহাকর্ষীয় বিভব শক্তি:

U = mV = -GMm/r

পৃথিবীর পৃষ্ঠে: U = -GMm/R

অসীম দূরত্বে: U = 0

বিভব ও ক্ষেত্রের তীব্রতার সম্পর্ক

I = -dV/dr

অর্থাৎ, ক্ষেত্রের তীব্রতা = বিভবের ঋণাত্মক নতি

মহাকর্ষীয় বিভব পার্থক্য

দুটি বিন্দুর মধ্যে বিভব পার্থক্য:

ΔV = V₂ - V₁ = GM(1/r₁ - 1/r₂)

একক ভরকে r₁ থেকে r₂ তে নিতে কৃত কাজ = mΔV

উদাহরণ: পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে একটি 10 kg বস্তুকে 1000 km উচ্চতায় নিতে কত কাজ করতে হবে?

ΔV = GM(1/R - 1/(R+h))

W = mΔV = m × GM × h/(R(R+h))

W = 10 × 9.8 × 6.4×10⁶ × 10⁶/(6.4×10⁶ × 7.4×10⁶)

W ≈ 9.2 × 10⁸ J

⚡ স্মরণীয়:
  • বিভব শক্তি ঋণাত্মক → বস্তু আবদ্ধ অবস্থায়
  • বিভব শক্তি শূন্য → বস্তু মুক্ত হওয়ার সীমায়
  • বিভব শক্তি ধনাত্মক → বস্তু মুক্ত

৮. মুক্তি বেগ (Escape Velocity)

সংজ্ঞা

কোনো বস্তুকে পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে যে ন্যূনতম বেগে উল্লম্বভাবে ছুড়ে দিলে তা পৃথিবীর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র অতিক্রম করে অসীম দূরত্বে চলে যায় এবং ফিরে আসে না, সেই বেগকে মুক্তি বেগ বলে।

v_e = √(2GM/R) = √(2gR)

পৃথিবীর জন্য:

v_e = √(2 × 9.8 × 6.4 × 10⁶)

v_e ≈ 11.2 km/s বা 40,320 km/h

নিগমন

শক্তির নিত্যতা সূত্র প্রয়োগ করে:

প্রাথমিক শক্তি = শেষ শক্তি

½mv_e² + (-GMm/R) = 0 + 0

½mv_e² = GMm/R

v_e = √(2GM/R)

মুক্তি বেগের বৈশিষ্ট্য

  • বস্তুর ভরের উপর নির্ভর করে না
  • গ্রহের ভর ও ব্যাসার্ধের উপর নির্ভর করে
  • ছোড়ার কোণের উপর নির্ভর করে না (যেকোনো দিকে একই)
  • কক্ষপথ বেগের √2 গুণ

বিভিন্ন মহাজাগতিক বস্তুর মুক্তি বেগ

বস্তু মুক্তি বেগ (km/s)
পৃথিবী 11.2
চাঁদ 2.4
মঙ্গল 5.0
বৃহস্পতি 59.5
সূর্য 617.5

মুক্তি বেগ ও কক্ষপথ বেগের সম্পর্ক

কক্ষপথ বেগ: v_o = √(GM/r)

মুক্তি বেগ: v_e = √(2GM/r)

v_e = √2 × v_o ≈ 1.414 v_o

🌌 মজার তথ্য:
  • চাঁদের মুক্তি বেগ কম বলে সেখানে বায়ুমণ্ডল নেই
  • ব্ল্যাক হোলের মুক্তি বেগ আলোর বেগের চেয়ে বেশি
  • রকেটকে 11.2 km/s বেগে ছোড়ার প্রয়োজন নেই, ধীরে ধীরে ত্বরান্বিত করা যায়
উদাহরণ: একটি গ্রহের ভর পৃথিবীর 4 গুণ এবং ব্যাসার্ধ 2 গুণ। এই গ্রহ থেকে মুক্তি বেগ কত?

v_e = √(2GM/R)

গ্রহের জন্য: v_e' = √(2G×4M/(2R)) = √(4GM/R) = √2 × √(2GM/R) = √2 × v_e

v_e' = 1.414 × 11.2 ≈ 15.8 km/s

🚀 সিমুলেশন: মুক্তি বেগ

মুক্তি বেগ = 11.2 km/s

৯. কৃত্রিম উপগ্রহ (Artificial Satellites)

সংজ্ঞা

মানুষের তৈরি যেসব বস্তু পৃথিবী বা অন্য কোনো গ্রহের চারদিকে নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘুরে তাদের কৃত্রিম উপগ্রহ বলে।

৯.১ কক্ষপথ বেগ (Orbital Velocity)

উপগ্রহ যে বেগে পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে তাকে কক্ষপথ বেগ বলে।

v_o = √(GM/r) = √(gR²/r)

পৃথিবীর পৃষ্ঠে (r = R):

v_o = √(gR) = √(9.8 × 6.4 × 10⁶) ≈ 7.9 km/s

নিগমন:

উপগ্রহের উপর মহাকর্ষ বল = প্রয়োজনীয় কেন্দ্রমুখী বল

GMm/r² = mv_o²/r

v_o = √(GM/r)

৯.২ পর্যায়কাল (Time Period)

উপগ্রহ পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করতে যে সময় নেয় তাকে পর্যায়কাল বলে।

T = 2πr/v_o = 2π√(r³/GM)

বা, T² = (4π²/GM) × r³

পৃথিবীর পৃষ্ঠ ঘেঁষে (r = R): T ≈ 84.6 মিনিট

৯.৩ উপগ্রহের শক্তি

গতিশক্তি:

K.E. = ½mv_o² = GMm/(2r)

বিভব শক্তি:

P.E. = -GMm/r

মোট শক্তি:

E = K.E. + P.E. = -GMm/(2r)

মোট শক্তি সবসময় ঋণাত্মক (আবদ্ধ অবস্থা)

⚡ লক্ষণীয়:
  • |P.E.| = 2 × K.E.
  • |E| = K.E.
  • উচ্চতা বাড়লে গতিশক্তি কমে, বিভব শক্তি বাড়ে
  • উচ্চতর কক্ষপথের উপগ্রহ ধীরে চলে

৯.৪ ভূস্থির উপগ্রহ (Geostationary Satellite)

যে কৃত্রিম উপগ্রহ বিষুবরেখার উপর স্থির অবস্থানে থাকে এবং পৃথিবীর সাথে একই কৌণিক বেগে ঘোরে তাকে ভূস্থির উপগ্রহ বলে।

শর্তসমূহ:

  1. কক্ষপথ অবশ্যই বিষুবরেখার উপর হতে হবে
  2. পর্যায়কাল = 24 ঘণ্টা
  3. ঘূর্ণন পৃথিবীর ঘূর্ণনের সমান ও সমদিকে
  4. নির্দিষ্ট উচ্চতা (প্রায় 36,000 km)

উচ্চতা নির্ণয়:

T = 2π√(r³/GM) = 24 ঘণ্টা = 86400 s

r³ = GMT²/(4π²)

r ≈ 4.23 × 10⁷ m

উচ্চতা h = r - R ≈ 36,000 km

ব্যবহার:

  • টেলিযোগাযোগ (TV, রেডিও সম্প্রচার)
  • আবহাওয়ার পূর্বাভাস
  • GPS নেভিগেশন
  • সামরিক নজরদারি

৯.৫ মেরু উপগ্রহ (Polar Satellite)

যে উপগ্রহ পৃথিবীর মেরুর উপর দিয়ে উত্তর-দক্ষিণ দিকে ঘোরে তাকে মেরু উপগ্রহ বলে।

বৈশিষ্ট্য:

  • উচ্চতা: 500-800 km
  • পর্যায়কাল: 90-100 মিনিট
  • পৃথিবীর সম্পূর্ণ পৃষ্ঠ পর্যবেক্ষণ করতে পারে

ব্যবহার:

  • ভূমি জরিপ ও মানচিত্র তৈরি
  • প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান
  • পরিবেশ পর্যবেক্ষণ
  • গুপ্তচরবৃত্তি

তুলনা: ভূস্থির ও মেরু উপগ্রহ

বৈশিষ্ট্য ভূস্থির মেরু
উচ্চতা ~36,000 km 500-800 km
পর্যায়কাল 24 ঘণ্টা 90-100 মিনিট
কক্ষপথ বিষুবরেখায় মেরুর উপর
পৃষ্ঠ কভারেজ নির্দিষ্ট এলাকা সম্পূর্ণ পৃষ্ঠ
ব্যবহার যোগাযোগ জরিপ, পর্যবেক্ষণ
🛰️ বাংলাদেশের উপগ্রহ:
  • বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ (2018) - ভূস্থির উপগ্রহ
  • বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ (পরিকল্পিত) - টেলিযোগাযোগ

🛰️ সিমুলেশন: উপগ্রহের কক্ষপথ

বেগ = ... km/s | পর্যায়কাল = ... মিনিট

১০. কেপলারের সূত্র

জোহানেস কেপলার (1571-1630) গ্রহগুলির গতি পর্যবেক্ষণ করে তিনটি সূত্র আবিষ্কার করেন।

প্রথম সূত্র: কক্ষপথের সূত্র (Law of Orbits)

সূত্র: প্রতিটি গ্রহ সূর্যকে কেন্দ্র করে উপবৃত্তাকার (elliptical) কক্ষপথে ঘোরে এবং সূর্য এই উপবৃত্তের একটি ফোকাসে (focus) অবস্থিত।

ব্যাখ্যা:

  • কক্ষপথ পুরোপুরি বৃত্তাকার নয়, সামান্য উপবৃত্তাকার
  • সূর্য ঠিক কেন্দ্রে নেই, একটু একপাশে (ফোকাস)
  • গ্রহ কখনো সূর্যের কাছে (perihelion), কখনো দূরে (aphelion)

দ্বিতীয় সূত্র: ক্ষেত্রফলের সূত্র (Law of Areas)

সূত্র: সূর্য থেকে কোনো গ্রহে টানা সংযোজক সরলরেখা সমান সময়ে সমান ক্ষেত্রফল অতিক্রম করে।

ব্যাখ্যা:

  • সূর্যের কাছে গ্রহের বেগ বেশি
  • সূর্য থেকে দূরে গ্রহের বেগ কম
  • ক্ষেত্রীয় বেগ (areal velocity) ধ্রুবক

dA/dt = constant = L/(2m)

যেখানে L = কৌণিক ভরবেগ (সংরক্ষিত)

তৃতীয় সূত্র: পর্যায়কালের সূত্র (Law of Periods)

সূত্র: কোনো গ্রহের পর্যায়কালের বর্গ (T²) তার কক্ষপথের অর্ধ-মুখ্য অক্ষের (semi-major axis) ঘনফলের (a³) সমানুপাতিক।

T² ∝ a³

বা, T² = (4π²/GM) × a³

বৃত্তাকার কক্ষপথের জন্য (a = r):

T² = (4π²/GM) × r³

প্রয়োগ:

দুটি গ্রহের জন্য:

T₁²/T₂² = a₁³/a₂³

উদাহরণ: পৃথিবীর পর্যায়কাল 365 দিন এবং কক্ষপথের ব্যাসার্ধ 1 AU। মঙ্গলের কক্ষপথের ব্যাসার্ধ 1.524 AU হলে তার পর্যায়কাল কত?

সমাধান: T₂²/T₁² = a₂³/a₁³

T₂²/365² = (1.524)³/1³

T₂ = 365 × √(1.524³) = 365 × 1.88 ≈ 686 দিন

কেপলারের সূত্র ও নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র

নিউটন দেখান যে তার মহাকর্ষ সূত্র থেকে কেপলারের সূত্র নিগমন করা যায়। এভাবে:

  • কেপলারের তৃতীয় সূত্র → F ∝ 1/r²
  • কেপলারের দ্বিতীয় সূত্র → কৌণিক ভরবেগ সংরক্ষণ
  • কেপলারের প্রথম সূত্র → কেন্দ্রমুখী বল
📜 ঐতিহাসিক তথ্য:
  • কেপলার টাইকো ব্রাহের 20 বছরের পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণ করেন
  • প্রথম সূত্র আবিষ্কার করতে 6 বছর লাগে
  • এই সূত্র আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভিত্তি

১১. গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সমাধান

সমস্যা ১: মহাকর্ষ বল

প্রশ্ন: দুটি 50 kg ভরের বস্তু 1 m দূরত্বে রাখা আছে। তাদের মধ্যে মহাকর্ষ বল কত?

সমাধান:

F = Gm₁m₂/r²

F = (6.67 × 10⁻¹¹ × 50 × 50) / 1²

F = 1.67 × 10⁻⁷ N

সমস্যা ২: পৃথিবীর ভর

প্রশ্ন: g = 9.8 m/s², R = 6.4 × 10⁶ m হলে পৃথিবীর ভর নির্ণয় কর।

সমাধান:

g = GM/R²

M = gR²/G

M = (9.8 × (6.4 × 10⁶)²) / (6.67 × 10⁻¹¹)

M ≈ 6 × 10²⁴ kg

সমস্যা ৩: উচ্চতায় g

প্রশ্ন: পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে 1600 km উচ্চতায় g এর মান কত? (R = 6400 km)

সমাধান:

g_h = g(1 - 2h/R)

g_h = 9.8(1 - 2×1600/6400)

g_h = 9.8(1 - 0.5) = 4.9 m/s²

সমস্যা ৪: মুক্তি বেগ

প্রশ্ন: চাঁদের ভর পৃথিবীর 1/81 ভাগ এবং ব্যাসার্ধ 1/3.7 ভাগ। চাঁদ থেকে মুক্তি বেগ কত?

সমাধান:

v_e = √(2GM/R)

v_moon/v_earth = √(M_moon/M_earth) × √(R_earth/R_moon)

v_moon/11.2 = √(1/81) × √(3.7/1)

v_moon = 11.2 × (1/9) × 1.92 ≈ 2.4 km/s

সমস্যা ৫: উপগ্রহের পর্যায়কাল

প্রশ্ন: 2000 km উচ্চতায় একটি উপগ্রহের পর্যায়কাল কত?

সমাধান:

r = R + h = 6400 + 2000 = 8400 km = 8.4 × 10⁶ m

T = 2π√(r³/GM) = 2π√(r³/gR²)

T = 2π√((8.4×10⁶)³/(9.8×(6.4×10⁶)²))

T ≈ 7500 s ≈ 125 মিনিট

সমস্যা ৬: শক্তি

প্রশ্ন: 500 kg ভরের একটি উপগ্রহ পৃথিবী থেকে 800 km উচ্চতায় আছে। তার মোট শক্তি কত?

সমাধান:

E = -GMm/(2r) = -mgR²/(2r)

r = 6400 + 800 = 7200 km = 7.2 × 10⁶ m

E = -(500 × 9.8 × (6.4×10⁶)²) / (2 × 7.2×10⁶)

E ≈ -1.4 × 10¹⁰ J

গুরুত্বপূর্ণ সূত্রাবলী (সংক্ষিপ্ত তালিকা)

  1. F = Gm₁m₂/r² (মহাকর্ষ বল)
  2. g = GM/R² (অভিকর্ষজ ত্বরণ)
  3. g_h = g(1 - 2h/R) (উচ্চতায়)
  4. g_d = g(1 - d/R) (গভীরতায়)
  5. V = -GM/r (বিভব)
  6. v_e = √(2GM/R) (মুক্তি বেগ)
  7. v_o = √(GM/r) (কক্ষপথ বেগ)
  8. T² = (4π²/GM)r³ (পর্যায়কাল)
  9. E = -GMm/(2r) (মোট শক্তি)

📚 অধ্যয়নের টিপস

  • ✅ প্রতিটি সূত্র নিজে করার চেষ্টা করুন
  • ✅ সংখ্যাগত সমস্যা বেশি বেশি অনুশীলন করুন
  • ✅ SI একক ব্যবহার করতে অভ্যস্ত হন
  • ✅ চিত্র এঁকে বুঝার চেষ্টা করুন
  • ✅ গাণিতিক ধাপগুলো মুখস্থ করুন
  • ✅ বিগত বছরের প্রশ্ন সমাধান করুন

শুভকামনা রইল! 🎓

Made by Md. Rakibul Hasan Rayhan